উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

গন্ধর্ব্যপুর পানি শোধনাগার প্রকল্প নিয়ে টানাপোড়েন

পরামর্শক নিয়োগ ঢাকা ওয়াসার
উত্তরা প্রতিদিন উত্তরা ডেস্ক ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১২:০১ অপরাহ্ণ
গন্ধর্ব্যপুর পানি শোধনাগার প্রকল্প নিয়ে টানাপোড়েন

ঢাকা ওয়াসার গন্ধর্ব্যপুর পানি শোধনাগার প্রকল্পের কাজ এক বছর বন্ধ থাকার পর শতকোটি টাকার বকেয়া পেয়ে সীমিত পরিসরে কাজ শুরু করেছে প্রকল্পের ফরাসি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সুয়েজ এবং ওটিভি ভিওলিয়া। তবে কাজ ফের শুরু হলেও কাটেনি সংকট; বরং বকেয়া পরিশোধ, অননুমোদিত বিল ছাড়, ক্ষতিপূরণ দাবি ঘিরে তৈরি হয়েছে বহুমুখী টানাপোড়েন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, ঢাকা ওয়াসার শীর্ষ নীতিনির্ধারক এবং ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূতের মধ্যে বৈঠকের পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি কাজ ফের শুরু করলেও প্রকল্পটি ঘিরে নানা অনিয়ম ও আর্থিক অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠেছে।

নথিপত্র অনুযায়ী, বকেয়া না পাওয়ায় গত বছরের ১৬ জুন থেকে ঠিকাদারি যৌথ প্রতিষ্ঠান তাদের কাজ পুরোপুরি বন্ধ রেখেছিল। সম্প্রতি বিপুল পরিমাণ বকেয়া অর্থ পরিশোধের পর তারা কাজ চালুর উদ্যোগ নেয়। এ-সংক্রান্ত চিঠিতে সুয়েজ জানায়, চলতি বছরের ২১ জুন থেকে তারা নিজস্ব জনবল নিয়ে সরাসরি কাজ শুরু করেছে এবং ২৭ জুন থেকে উপ-ঠিকাদারদের যুক্ত করে সার্বিক কাজ সচল করার প্রক্রিয়া গ্রহণ করে। তবে এক বছর কাজ বন্ধ থাকার ফলে প্রকল্পের সার্বিক সময়সীমা ও পরিচালন ব্যয়ে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে বলে দাবি তাদের। এ স্থগিতকালের ক্ষতিপূরণ, অতিরিক্ত সময় এবং বর্ধিত পরিচালনা খরচের পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত দাবি শিগগির ওয়াসার কাছে পেশ করার ঘোষণা দিয়েছে ফরাসি কোম্পানিটি।

অন্যদিকে, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের কাজ এরই মধ্যে ৯৭ শতাংশ সম্পন্ন হয়ে গেছে। অথচ বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে প্রকল্প ব্যয় নতুন করে ১ হাজার ৫০১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বাড়ানোর একটি প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে মূল ৩ হাজার ৬ কোটি ৪ লাখ টাকার প্রকল্পের প্রাক্কলিত মূল্য দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৫০৮ কোটি ১ লাখ টাকায়, যা মোট ব্যয়ের প্রায় ৪৯.৯৭ শতাংশ বৃদ্ধি। সংশোধিত পিপিআর আইন ২০২৫ অনুযায়ী, যে কোনো প্রকল্পের ব্যয় সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর নিয়ম থাকলেও, এখানে পিপিআর ২০০৮-এর বিশেষ ধারার দোহাই দিয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এ প্রস্তাবিত বর্ধিত ব্যয়ের মধ্যে দর সমন্বয়ে ৬৬৭.১৪ কোটি, কর ও শুল্কে ৩৪০.৩২ কোটি, সাশ্রয়ী ডিজাইন ভেরিয়েশনে ৮৩.৮২ কোটি, পুকুর অতিক্রমের জন্য ৭১.৮৩ কোটি, নকশা পরিবর্তনের কারণে ৬০.৬১ কোটি, জমি অধিগ্রহণের জটিলতায় ৫৪.০৪ কোটি এবং দুটি কালভার্ট নির্মাণে ৪৬.৮৯ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, অনাকাঙ্ক্ষিত কবরস্থান অপসারণ এবং সাইট হস্তান্তরে বিলম্বকে ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে। তবে তথ্য বলছে, প্রকল্পের ব্যয় ও সময় বৃদ্ধির প্রস্তাবের সেই ফাইল এখনো অনুমোদন হয়নি, মন্ত্রণালয়েই রয়েছে।

এদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং বিল পরিশোধকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ওয়াসা সূত্রে জানা যায়, সুয়েজকে এখতিয়ারবহির্ভূত বিল ছাড় দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের জুনের শুরুতে তিন ধাপে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম মুরাদ সুয়েজকে প্রায় ১২৬ কোটি টাকা পরিশোধ করেন। নথি অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ২০২৬ সালের ৩ জুন ৩৬ কোটি ৯ লাখ ৮৯ হাজার ৯০৬ টাকা দেওয়া হয়। দ্বিতীয় ধাপে ১০ জুন ইউরোতে (৩৫ লাখ ৫৯ হাজার ৪৮৮ ইউরো) প্রায় ৪৯ কোটি ৯৮ লাখ ৫৮ হাজার ৮৮৯ টাকা এবং তৃতীয় ধাপে ১৫ জুন ইউরোতে (২৮ লাখ ৭৩ হাজার ৪৮৮ ইউরো) ৪০ কোটি ৩৫ লাখ ২৩ হাজার ৯১৯ টাকা দেওয়া হয়।

এর আগেও চুক্তি বা কোনো অনুমোদন ছাড়া সুয়েজকে প্রকল্প পরিচালক ওয়াহিদুল ইসলাম ৬শ কোটি টাকা বিল পরিশোধ করেছেন। সে সময় প্রকল্প সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলেছিলেন, ফরাসি প্রতিষ্ঠান সুয়েজ তাদের জিম্মি করে রেখেছে। সুয়েজ নাকি সেই সময় বলেছিল, ঢাকা-সিলেট হাইওয়েতে পাইপলাইনের কাজের অনুমতি ওয়াসা থেকে পাচ্ছে না তারা। এ কাজের জন্য লোকবল আর যন্ত্রপাতি অলস বসিয়ে রাখতে হচ্ছে বলে জরিমানা বাবদ প্রতিদিন প্রায় ২৫ লাখ টাকা (২৪ লাখ ৯০ হাজার) দাবি করে সুয়েজ।

এদিকে, প্রকল্পটিতে কেবল আর্থিক অনিয়মই নয়, প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা ও আইনি জটিলতাও প্রবল। ২৩ কিলোমিটার এলাকায় পাইপ বসাতে গিয়ে অননুমোদিত চীনা কোম্পানি থেকে পাইপ কেনার অভিযোগে সুয়েজের বিরুদ্ধে চীনের আদালতে মামলা চলমান থাকলেও ওয়াসা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। অন্যদিকে, সড়ক ও জনপথ বিভাগ ঢাকা-সিলেট হাইওয়ের চলমান সংস্কার কাজের সময়েই ৯৫০ মিটার পাইপলাইন ও কালভার্ট দুটি নির্মাণের বারবার তাগিদ দিলেও ওয়াসা উদ্যোগ নেয়নি। ফলে ভবিষ্যতে সদ্য নির্মিত সড়ক আবার খোঁড়াখুঁড়ির দরুণ অতিরিক্ত সময় ও বিপুল অর্থ অপচয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

এই পুরো পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা ওয়াসা ও সরকারি কর্মকর্তাদের বক্তব্যের মধ্যেও ভিন্নতা দেখা গেছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত সচিব জানান, গন্ধর্ব্যপুর পানি শোধনাগার প্রকল্প নিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সুয়েজ তাদের ক্ষতিপূরণ দাবি করতেই পারে। সেই দাবি কতটুকু যুক্তিযুক্ত তা যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে। অনুমোদন ছাড়া অর্থ করতে পারবেন না পিডি।

অন্যদিকে, স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব (পানি সরবরাহ অধিশাখা) হোসনা আফরোজ গণমাধ্যমকে বলেন, গন্ধর্ব্যপুর পানি শোধনাগার প্রকল্প ২০২৭ সালের জুনে শেষ হবে। তবে, প্রকল্পের কাজ করতে গিয়ে মহাসড়ক খোঁড়াখুঁড়িসহ বেশকিছু প্রতিবন্ধকতা সামনে এসেছে। সমস্যাগুলো সমাধান শেষে প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে পারবে বলে মনে করেন তিনি। প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে আসেনি বলেও জানান তিনি।

প্রকল্প পরিচালক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম মুরাদ জানান, প্রকল্পের ঠিকাদারের অনেক বিল বাকি। প্রকল্পের মাঝপথে কনসালট্যান্ট বা পরামর্শক ছিল না, যার কারণে প্রকল্পের কোনো কিছু ফাইনাল হয়নি। এখন প্রকল্পে কনসালট্যান্ট বা পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাদের মতো করে অনেক কিছুই দাবি করবে। প্রকল্পের ত্রুটি-বিচ্যুতি ও বিল পরিশোধের ইস্যু প্রকল্পে কনসালট্যান্ট বা পরামর্শক ফাইনাল করবে। এর আগে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও ঢাকা ওয়াসার বোর্ড সভায় প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হবে।

অনুমোদন ছাড়াই প্রকল্পের ১২৬ কোটি টাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক বলেন, এসব মনগড়া কথাবার্তা, কোনো ভিত্তি নেই। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্বল্প পরিসরে কাজ শুরু করেছে, আর প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।

ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম  বলেন, ‘ঢাকা এনভায়রনমেন্টালি সাসটেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই’ প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধি এখনো হয়নি। বিভিন্ন কারণে সুয়েজ দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ রেখেছিল। বর্তমানে স্বল্প পরিসরে কাজ শুরু করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রকল্পের অর্থছাড়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে অনিয়ম হলে অডিটে তা বেরিয়ে আসবে। অনুমোদন ছাড়া আগাম বিল পরিশোধের সুযোগ নেই। বিষয়টি প্রকল্প পরিচালকের কাছ থেকে খোঁজ নিতে হবে।

Read more — জাতীয়
Home