উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

গ্যাস সংকটে যাত্রীদের পকেট কাটছেন সিএনজি অটোরিকশা চালকরা

উত্তরা প্রতিদিন উত্তরা ডেস্ক ৯ আগস্ট ২০২৬, ০৬:১৭ অপরাহ্ণ
গ্যাস সংকটে যাত্রীদের পকেট কাটছেন সিএনজি অটোরিকশা চালকরা

দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকটে কয়েক সপ্তাহ যাবৎ বিপাকে পড়েছেন রাজধানীর সিএনজি অটোরিকশার চালক ও যাত্রীরা। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাসের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের। কোথাও কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও পর্যাপ্ত গ্যাস মিলছে না। ফলে রাস্তায় সিএনজি অটোরিকশার সংখ্যা অনেকটা কমে গেছে। আর সংকটের সুযোগ নিচ্ছেন অনেক চালক। যাত্রীদের কাছ থেকে দাবি করছেন নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা।

 

রোববার (৯ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে সিএনজি চালিত গাড়ির লম্বা সারি। প্রায় প্রতিটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনেই অন্তত ৫০-৬০টি গাড়ি সিরিয়ালে আছে গ্যাস নেওয়ার জন্য। এছাড়া প্রেসার কম থাকায় কোনো সিএনজি অটোরিকশাতে ৫০-৬৫ টাকার বেশি গ্যাস নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। টানা ৩টি সিএনজি অটোরিকশা পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, প্রথমটিতে ৫৭ টাকার, দ্বিতীয়টিতে ৬২ টাকার ও তৃতীয়টি ৬৪ টাকার গ্যাস ঢুকেছে।

সিএনজি অটোরিকশা চালকরা জানিয়েছেন, গ্যাস সংকটের কারণে আমাদের বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বিভিন্ন স্টেশনে দীর্ঘ অপেক্ষার পরও পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে কখনও কখনও মাত্র ৮০ থেকে ১০০ টাকার গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। যা দিয়ে ২-১টি ট্রিপের বেশি চালানো সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু জমা তো মালিককে আমার ঠিকই দিতে হয়।

যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্যাসের সংকটে রাস্তায় সিএনজি অটোরিকশার সংখ্যা কম। ফলে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় যাত্রীদের জন্য অটোরিকশা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে অফিস সময়, সকাল ও সন্ধ্যায় একটি সিএনজি পেতে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এই সুযোগে চালকরা নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়া হাঁকছেন।

সরকারি গেজেটে দৈনিক জমা ৯০০ টাকা নির্ধারণ করা আছে। কিন্তু গ্যাসের জন্য চার-পাঁচ ঘণ্টা সময় চলে যায়, এরপরও মালিককে জমার টাকা দিতে হয়। এ কারণে অনেক সময় যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া নিতে হয়।

মো. গোলাপ হোসেন সিদ্দিকী, সদস্য সচিব, ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা চালক ঐক্য পরিষদ

সিএনজি চালক আলমগীর হোসেন বলেন, বর্তমানে আমাদের পরিস্থিতি খুবই খারাপ। দিনে দুই থেকে তিনবার গ্যাস নিতে হয়। যেখানে একবার গ্যাস নিলেই হতো, সেখানে গ্যাসের চাপ না থাকায় তিনবার নিতে হচ্ছে। কখনো ৬০ টাকার, কখনও ৮০ টাকার, কখনো ১০০ টাকার গ্যাস পাওয়া যায়। এভাবে গ্যাস নিয়ে আমাদের পোষায় না। কারণ, দিন শেষে মালিককে জমার টাকা দিতে হয়, আবার নিজেদের পকেটেও কিছু থাকে না। তখন বাধ্য হয়ে বেশি ভাড়া নিতে হয়। এ নিয়েও যাত্রীদের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়।

আরেক চালক জালাল হোসেন বলেন, প্রতিদিন গাড়ি চালাতে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকার গ্যাস লাগে। এর মধ্যে একবার সিরিয়াল দিলে অন্তত তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় লাগে। তখন ৬০-৭০ টাকার গ্যাস পাওয়া যায়। এতে তো ৪০০ টাকার গ্যাসের হিসাব মেলে না। জ্যামের এই শহরে দুই-তিনবার পাম্পে গিয়ে গ্যাস নিতে হলে আমরা ট্রিপ দেব কখন?

নিয়মিত খিলগাঁও তালতলা থেকে গুলশানের অফিসে যাতায়াত শাহানাজ বেগমের। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, আগে মোটামুটি ২০০ টাকার মধ্যে অফিসে যেতে পারতাম। কিন্তু ইদানীং সিএনজি পাওয়াই যায় না সকালের দিকে। যা পাই, তারাও ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা দাবি করে। ২৫০ টাকার নিচে কেউ যেতেই চায় না।

তাসলিমা আক্তার নামের অন্য এক যাত্রী বলেন, পূর্ব রামপুরা থেকে মহাখালী বাস টার্মিনাল পর্যন্ত ১৫০-১৮০ টাকার মধ্যে আগে সিএনজিতে আসতাম। আজ আসতে হয়েছে ২৫০ টাকায়। মিটার ব্যবস্থা তো আগেই ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন গ্যাসের অযুহাতে অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছে চালকরা।

বিষয়টি নিয়ে ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা চালক ঐক্য পরিষদের সদস্য সচিব মো. গোলাপ হোসেন সিদ্দিকী  বলেন, গ্যাসের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে আমাদের। গ্যাস নিতে গেলে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। এরপরও পাম্পে গিয়ে ঠিকমতো গ্যাস পাওয়া যায় না। গ্যাস সংকটের কারণে গাড়ি চালানোর সময় কমে যাচ্ছে, কিন্তু মালিকের দৈনিক জমার টাকায় কোনো ছাড় নেই। বর্তমানেও অনেক মালিক দৈনিক ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত জমা নিচ্ছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুই শিফটে গাড়ি চালানো হয়— সকালে একজন ও রাতে আরেকজন চালক। ফলে একজন চালককে ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা পর্যন্ত জমা দিতে হয়। আর এক হাতে (১৩-১৪ ঘণ্টা) গাড়ি চালালে ১ হাজার ২০০ টাকা দিতে হয়।

যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, সরকারি গেজেটে দৈনিক জমা ৯০০ টাকা নির্ধারণ করা আছে। কিন্তু গ্যাসের জন্য চার-পাঁচ ঘণ্টা সময় চলে যায়, এরপরও মালিককে জমার টাকা দিতে হয়। এ কারণে অনেক সময় যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া নিতে হয়। যাত্রীরা বিষয়টি বুঝতে পেরে অনেক সময় আপত্তি করেন না। তবে সবাই দেন না। আমরা কমই চাই।

তবে সংকটের সুযোগ নিয়ে নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার সুযোগ নেই। ২০২৫ সালে সিএনজি অটোরিকশার মিটারের ভাড়ার বাইরে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধে শাস্তির কথা জানিয়েছিল বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। সে সময় নির্ধারিত ভাড়া ছিল প্রথম দুই কিলোমিটারে সর্বনিম্ন ৪০ টাকা, পরবর্তী প্রতি কিলোমিটারে ১২ টাকা এবং অপেক্ষার প্রতি মিনিটে ২ টাকা।

উল্লেখ্য, গত জুলাইয়ের শেষের দিকে মহেশখালীর ফ্লোটিং এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকট তৈরি হয়। যার ফলে সিএনজি ও অটো গ্যাস স্টেশনগুলোতে তীব্র গ্যাস স্বল্পতা ও লো-প্রেশার দেখা দেয়। এই সংকটের কারণে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলার ফিলিং স্টেশনগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ সারির সৃষ্টি হয় এবং সিএনজিচালিত গণপরিবহন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। তবে সম্প্রতি পেট্রোবাংলা ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি মেরামত করে পুনরায় চালু করায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ বেড়েছে এবং ফিলিং স্টেশনগুলোর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।

 

Read more — জাতীয়
Home